শেরপুরে গারো গ্রামে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল

আইপিনিউজ বিডি, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্টঃ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পূর্ব গজারীকুড়া-বন্দধারা এলাকায় অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গারো (মান্দি) জনগোষ্ঠীর গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের পর পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে ঢাকার একটি ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল।

গত ১৩-১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় তারা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন গারো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং হামলায় তাদের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সভাপতি ও আদিবাসী অধিকার কর্মী অলীক মৃ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাবেক সভাপতি এন্টনী রেমা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও আইপিনিউজের প্রতিনিধি বেবিলন চাকমা, বাগাছাস নেতা সৌহার্দ্য চিরান, গারো স্টুডেন্টস ফেডারেশন (জিএসএফ) প্রতিনিধি নিপুল ম্রং সহ মোট আটজন।

পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলটি হামলার ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এসআই হানিফের সঙ্গেও কথা বলে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এলাকার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং হামলার পর সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে তথ্য নেন।

প্রতিনিধি দলের সদস্য অলিক মৃ বলেন, হামলার পর এলাকায় গারো জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য বেবিলন চাকমা বলেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি একটি গুরুতর বিষয় এবং এর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরীহ গারো জনগোষ্ঠীর গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় যে-ই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একইভাবে সঠিক প্রমাণ ব্যতীত গারোদের গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

পূর্ব গজারীকুড়া গ্রামে গারো আদিবাসী পরিবারের ওপর হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক তালিকাঃ
১। নারগিস মানখিন
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ১৫-২০ জন বাড়িতে ঢুকে ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ভাঙচুর। ১টি গরু, ২টি ছাগল এবং হাঁস লুটের অভিযোগ।
২। পিটার মানখিন
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর। তাঁকে বর্তমানে জেলহাজতে রাখা হয়েছে। পিটার মানখিনের মেয়ে সমাপ্তি চাম্বুগংকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ। ০১টি গরু, ০৩টি ছাগল, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৩। সিমন মানখিন
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের আসবাবপত্র ব্যাপক ভাঙচুর। ০৭টি ছাগল, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৪। বিউটি দফো
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ৪টি ছাগল, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৫। অনিমা হাউই
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল ভাঙচুর, ঘরের দরজা ও ভেতরের জিনিসপত্র ভাঙচুর এবং শারীরিক আক্রমণ। ০২টি দেশি গরু, ০৩টি ছাগল, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা লরেন্স বনোয়ারী
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র, দরজা ব্যাপক ভাঙচুর। ৩টি গরু, নগদ ৫০,০০০/- টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন, ১টি চার্জার ফ্যান, ১টি টর্চ লাইট, ১টি স্মার্টফোন, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৭। শিখা চিসাম
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও নারীদের উপর শ্লীলতাহানির চেষ্টা। নগদ ১,৫০,০০০/- টাকা, চার জোড়া কানের দুল, ১ ভরি গলার চেইন লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী শিখা চিসামের দাবি, মৃত বিল্লালের ছেলে এ লুটপাটের নেতৃত্ব দেন। ।
৮। শিল্পী মানখিন(৪৬)
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরের মালামাল ভাঙচুর এবং শারীরিকভাবে আক্রমণ। ২টি ছাগল, ২টি গরু, হাঁস, মুরগি, নগদ ৫০০০ টাকা, টিভি, মাছ ধরার জাল লুটের অভিযোগ।
৯। বিপোলা চিরান
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ফ্রিজ, আসবাবপত্র ভাঙচুর, চাল-ডাল লুটের অভিযোগ।
১০। চিচিলা মানকিন(৬৫)
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ দরজা, হাড়ি পাতিল ভাঙচুরের অভিযোগ। চাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।
১১। লাইকিওয়ে মারমা(৩৮)
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ৭ টি ছাগল লুটের অভিযোগ।
১২। অসীম ম্রং
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরে মারাত্মক ভাঙচুর। ১টি ষাঁড়, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, মূল্যবান জমির কাগজপত্র, টেলিভিশন, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
১৩। নীলু চাম্বুগং
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটঃ ঘরের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর। আনুমানিক ২০ মণ ধান/চাল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং ফ্রিজ লুট করে নিয়ে যায়।

প্রতিনিধি দলটি দাবি জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে। পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতির দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।

Share: