শিরোনামনারায়ণগঞ্জে রিয়া সরেন (১৯) নামে এক সাঁওতাল তরুণীর মরদেহ উদ্ধার
IP NEWS BD
নীড়পাতা / জাতীয় / ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সংবাদ স...
জাতীয়

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলন

আইপিনিউজ: আজ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, রোজ: মঙ্গলবার, সকাল ১১টায় ঢাকা, সেগুনবাগিচার রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন এর আয়োজনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিশ্রুতি ও পাহাড়ের দূরবর্তী এলাকার ভোটারদের এবং সমতলের আদিবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। আরও বক্তব্য রাখেন আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

মূল বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যাবদি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্খা ও ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুাত্থান পরবর্তীতে যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে অন্তর্ভুক্তিমুলক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো সেটা এখনো অনিশ্চিত। এ প্রেক্ষিতে, আগামী দিনে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অন্তর্ভুক্তিমুলক ব্যবস্থার প্রবর্তনে সংস্কারের ধারাকে অব্যাহত রাখা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠির নাগরিক ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে সেখানকার আদিবাসীরা দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনুন্নত সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বসবাস করেন। সামরিক উপস্থিতি ও অনেক ক্ষেত্রে সেখানকার রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল না হওয়ার দরুণ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবে তাঁরা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নানা ক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে না। এমনকি জনগণনার সময়ও প্রান্তিক অঞ্চলে থাকা আদিবাসীরা বাদ পড়ে থাকেন কেবলমাত্র ভৌগোলিক দুর্গমতার মধ্যে বসবাস করবার কারণে। ঠিক তেমনি জাতীয় নির্বাচনের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা থেকে অনেক আদিবাসী জনগণ বাদ পড়ে থাকেন এই একই কারণে। ভোট কেন্দ্র থেকে বসবাসের স্থান দূরবর্তী হওয়ার কারণে তাঁরা স্বত:প্রণোদিত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হন না। অন্যদিকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী বিভিন্ন জনপদের আদিবাসীরা যাদের যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌযান তাঁরাও প্রশাসনের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত থাকেন। কেননা প্রতিটি নির্বাচনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে ও পরের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহন ব্যতীত সকল ধরণের যোগাযোগের বাহন নিষিদ্ধ করা হয়। এতে কেবলমাত্র নৌযানের উপর নির্ভরশীল আদিবাসীরা ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত হন কিংবা নিরুৎসাহিত হন। এক্ষেত্রে এই ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাসকারী আদিবাসী জনগণের কথা বিবেচনায় রেখে নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া এই নিয়ম উক্ত এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে শিথিল করবার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই। অন্যদিকে ভোটকেন্দ্রে আসার সময় আদিবাসী ভোটরদেরকে নিরাপত্তাবাহিনী কর্র্তক অহেতুক তল্লাশি ও হয়রানি না করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

মূল বক্তব্যে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও সমতলের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। একদিকে জাতিগত পরিচয়হীনতা এবং ভূমি অধিকারহীন বাস্তবতায় জাতিগতভাবে সংখ্যায় কম, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এইসব মানুষেরা নানাভাবে প্রায়শ: সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন। একটু পেছনে ফিরে দেখলে বোঝা যায়, নির্বাচনী রাজনীতির ডামাডোলের মধ্যে তাঁরা নিপীড়ন, সহিংসতা ও হয়রানির শিকারের পরিণত হন। নির্বাচন কেন্দ্রিক সামগ্রিক রাজনীতিতে দেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তাই আমরা নির্বাচন প্রাক্কালে এই মুহূর্তে দেশের আদিবাসী জনগণসহ সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য আরো বেশী মনযোগী ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য সরকার, আইন রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আদিবাসীদের সমস্যাটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগী ভূমিকা দেখতে চাই।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ও সমতলে আদিবাসীরা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় হয়রানির শিকার হন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য মোতাবেক অতীতের থেকে যদি এই নির্বাচন ভালো হয়, তাহলে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভোট দিতে আসা আদিবাসীদের জন্য যাবতীয় সকল সুবিধা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দেশ বিদেশে অনেক সুনাম রয়েছে। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে আসন্ন নির্বাচন স্বার্থক করার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূ্র্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন করার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানাই। আদিবাসীদের সমস্যাটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগী ভূমিকা দেখতে চাই।

লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, আমাদের নির্বাচন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক দলকে নিবন্ধিত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা অবশ্যই রাখা উচিত ছিল। আমাদের দেশে আঞ্চলিক দলগুলোকে নির্বাচন করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয় না। এই জায়গায় নির্বাচন নিবন্ধন আইনে পরিবর্তন হওয়া দরকার এবং এই ব্যাপারে পার্বত্য নেতৃবৃন্দের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটা নেই। সেই সুযোগটা দেওয়া উচিত।

আবু সাঈদ খান আরো বলেন, পাহাড়ের সমস্যা আর সমতলের সমস্যা এক না। সমতলের চোখ দিয়ে পাহাড়কে দেখলে হবে না। পাহাড়ের মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলসমূহকে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে স্পষ্টভাবে বার্তা দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের সকল আদিবাসীদের অন্ধকারে ও পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। সকল আদিবাসীদেরকে দেশের মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। তাই তাঁদের সামাজিক, অর্থনৈতি ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ে নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা দরকার। এই পরিষদের কাজকে আরো সচল করতে হবে। তাই ৩ পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচন হওয়া দরকার।

মেইনথিন প্রমিলা বলেন, এই বাংলাদেশের জন্ম লগ্ন থেকে আদিবাসীদেরকে যে পরিমাণ নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে তা আপনারা ভালোভাবেই জানেন।  আমরা বর্তমানে যে অসুস্থ পরিবেশে আছি, ভবিষ্যতে আদিবাসী নারী ও আদিবাসীদের অবস্থা কি হবে তা আমার জানা নেই।
আদিবাসী জাতিসমূহের কথা চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন ছাড়া স্পষ্টভাবে কেউ বলছেনা। আদিবাসীদের সমস্যার কথা শোনার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই আমাদেরকে ডাকেনি।

প্রশ্নোত্তর পর্বে অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির একটি গণতান্ত্রিক দিক রয়েছে। সেটির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আমরা আশাবাদী। কিন্তু, মানবাধিকার সহ অন্যান্য বিষয়গুলো যেভাবে রাজনৈতিক প্রচারণায় আসার কথা, কিন্তু আমরা তা দেখছি না।

প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, আমাদের নির্বাচন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক দলকে নিবন্ধিত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা অবশ্যই রাখা উচিত ছিল। আমাদের দেশে আঞ্চলিক দলগুলোকে নির্বাচন করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয় না। এই জায়গায় নির্বাচন নিবন্ধন আইনে পরিবর্তন হওয়া দরকার এবং এই ব্যাপারে পার্বত্য নেতৃবৃন্দের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটা নেই। সেই সুযোগটা দেওয়া উচিত।

মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপনে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরো শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং আগামীর সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত দাবিসমূহ তুলে ধরছি-

ক. অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি:
১. দূরবর্তী পাহাড়ের আদিবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে আবাসনসহ খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা; এবং
২. সমতল ও পাহাড়ে ভোটকেন্দ্রগামী সকল আদিবাসী ভোটারদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং অযথা হয়রানি বন্ধ করা।

খ. নির্বাচনপন্থী সকল রাজনৈতিক দলসমূহ ও আগামী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও দাবি:

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচী ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এই চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করা;

২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে;

৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিকীকরণ ও স্থানীয় শাসন নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যথাযথ ক্ষমতায়ন করা;

৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’কে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্ভাত্ত ও ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাঁদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা;

৫. দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা;

৬. ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল স্তরের স্থানীয় সরকারে সমতলেরর আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ ও আদিবাসী জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা; এবং

৭. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।

সবশেষে, প্রশ্নাত্তর পর্বের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে সংবাদ সম্মেলনের ইতি ঘটে।